গত ৮ এপ্রিল ২০২৫ যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার সঙ্গে ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’ চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। আর এখন আমাদের নাম যুক্ত হলো সেই তালিকায়, যেখানে রয়েছে বিশ্বের আরও ৫৩টি দেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’ আসলে কী? আমাদের উপকারই বা কী? এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিশ্বের দুই মহাশক্তি, চীন ও রাশিয়া কেন এখনো এই চুক্তির বাইরে?

তার আগে আসা যাক আমাদের নিজেদের বাস্তবতায়। অনেকেই জানেন না, বাংলাদেশেও একটি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা আছে, নাম ‘স্পারসো’। না জানাটাই স্বাভাবিক, কারণ গত ৪৫ বছরে এই সংস্থার উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য নেই। ভারতের মতো প্রতিবেশী যখন একের পর এক চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযানে সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা এখনও সীমিত অবজারভেশন আর occasional রিপোর্টেই আটকে আছি। এমনকি প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পারসো বছরে গড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাও করছে না।

বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো)

সবচেয়ে হাস্যকর ব্যাপার—এই সংস্থার একসময়ের চেয়ারম্যান ছিলেন একজন কৃষিবিদ। স্পষ্টতই বোঝা যায়, মহাকাশ গবেষণার গুরুত্ব আমাদের দেশে কতটা উপেক্ষিত ছিল। তবে এবার হয়তো সেই অবহেলার দিন শেষ হতে চলেছে।

২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও আরও আটটি দেশের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয় ‘আর্টেমিস অ্যাকর্ডস’, যা একটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ সহযোগিতা চুক্তি। এখন পর্যন্ত ৫০-এর বেশি দেশ এতে সই করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ হলো ৫৪তম।

এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হল চাঁদ, মঙ্গল এবং অন্যান্য মহাকাশীয় বস্তুর শান্তিপূর্ণ ও টেকসই অনুসন্ধান।
এটি একটি অ-বাধ্যতামূলক চুক্তি, মানে কেউ চাপ দিয়ে কাউকে এতে আনছে না। বরং এটি এমন এক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে দেশগুলো একে অপরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহাকাশে কাজ করতে পারে।

চুক্তির মূল কিছু দিক হলঃ

  • সব মহাকাশ কার্যক্রম হতে হবে শান্তিপূর্ণ, আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
  • গবেষণার তথ্য শেয়ার করতে হবে, তবে ব্যবসায়িক ও নিরাপত্তাজনিত তথ্য সুরক্ষিত থাকবে।
  • নভোচারীরা বিপদে পড়লে, অন্য দেশগুলো তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে।
  • মহাকাশে অতিরিক্ত আবর্জনা না জমে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
  • ঐতিহাসিক স্থান (যেমন অ্যাপোলো ল্যান্ডিং সাইট) সংরক্ষণ করতে হবে।
  • এবং মহাকাশ সম্পদের ব্যবহার সম্ভব, তবে সেটা কোনো দেশের ব্যক্তিগত মালিকানা হতে পারবে না।
ছবি: মো: জাহিদুর রাব্বি / দ্য ডেইলি স্টার

কিন্তু যারা এই আর্টেমিস আকর্ডস যোগ দিবে, তাদের সুবিধা কি?

এতে সই করে বাংলাদেশ কী পাবে? আর্টেমিস আকর্ডস-এ যোগ দিলে দেশগুলো বেশ কিছু সুবিধা পেতে পারে।

  • যোগদানকারী দেশগুলো আর্টেমিস প্রোগ্রামের অংশ হয়ে ভবিষ্যতের চন্দ্রাভিযানে অংশ নিতে পারবে।
  • মহাকাশ গবেষণায় অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।
  • সইকারী দেশগুলো বৈজ্ঞানিক তথ্য খোলামেলা শেয়ার করতে পারবে, যা সবার জন্য উপকারী। একই সাথে প্রাইভেট বা এক্সপোর্ট কন্ট্রোলড তথ্যের যথাযথ সুরক্ষাও নিশ্চিত করা হয়।
  • মহাকাশ ভিত্তিক অবকাঠামো পরিচালনা করার জন্য আন্তর্জাতিক মানের টেকনোলজি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করা হয়, যাতে সব দেশকে সমান সুযোগ পাওয়া যায়।
  • মহাকাশ সম্পদ আহরণ থেকে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
  • ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ স্থান এবং যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের বিষয়টি আর্টেমিস আকর্ডসে অন্তর্ভুক্ত, যাতে সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক মূল্য বজায় থাকে।
  • এই চুক্তি আমাদের বৈশ্বিক মহাকাশ কমিউনিটিতে একটি সম্মানজনক অবস্থান এনে দিতে পারে।

তবে প্রশ্ন থাকতে পারে, এত বড় বড় দেশের ভিড়ে, বাংলাদেশের মতো ছোট বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জায়গাটা কোথায়? তারা কি আদৌ কিছু পাবে?

উত্তরটা হলো—হ্যাঁ, আর্টেমিস অ্যাকর্ডস ছোট দেশগুলোর জন্য বেশ কিছু কৌশলগত সুবিধার দিবে। এই চুক্তিতে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ যেমন উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে, তেমনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মহাকাশ সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করেও নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারবে। শুধু প্রযুক্তি নয়, এই সুযোগে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী আর গবেষকরাও আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে পারবে। এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক মহাকাশ নীতিতে মতামত দেওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়। সাধারণত এই জায়গাগুলো শুধুই বড় দেশগুলোর জন্য সংরক্ষিত থাকে, কিন্তু আর্টেমিস অ্যাকর্ডস সেই ব্যবধানটা অনেকটা কমিয়ে দিচ্ছে।

তাছাড়া, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ প্রকল্পে কাজ করলে শুধু জ্ঞান নয়, বিনিয়োগ আর প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকারও পাওয়া সম্ভব। এইভাবে ধীরে ধীরে দেশের নিজস্ব মহাকাশ খাত গড়ে তোলা যাবে—যেটা এখন পর্যন্ত কেবল আমাদের কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাকাশ সম্পদের ব্যবহার। ভবিষ্যতে চাঁদ বা অন্য কোনো জায়গা থেকে সম্পদ আহরণ করা হলে, এই চুক্তিতে থাকা দেশগুলো সেই প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারবে। এটা শুধুই বৈজ্ঞানিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও বিশাল সুযোগ।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল এটা বাংলাদেশের জন্য একটা গ্লোবাল নেটওয়ার্কে প্রবেশ করার সুযোগ। তথ্য আদান-প্রদান, গবেষণায় অংশগ্রহণ, আর অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা—এসব মিলিয়েই তৈরি হবে এক নতুন সম্ভাবনার দেশ। অর্থাৎ, আর্টেমিস অ্যাকর্ডস আমাদের শুধুই মহাকাশে নয়, বৈশ্বিক মানচিত্রেও একটি নতুন পরিচয় এনে দিতে পারে।

তবে সব দেশই যে আর্টেমিস অ্যাকর্ডস নিয়ে উৎসাহী, তা নয়। অনেকের মতে, এই চুক্তির পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি, যা মূলত নিজের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি। বিশ্বের শক্তিশালী দুই দেশ—চীন এবং রাশিয়া—এই আকর্ডসকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। রাশিয়া এটাকে বলেছেন, “আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশল।” তাদের ভাষায়, এটা এমন এক প্রয়াস যেখানে মার্কিন নেতৃত্বে একটি মহাকাশ ‘ক্লাব’ তৈরি হচ্ছে, যেখানে অন্যদের অংশ নেওয়া মানেই সেই শর্ত মেনে চলা।

চীন আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছে, এটা এক ধরনের “আধুনিক উপনিবেশবাদী” প্রচেষ্টা—যেখানে চাঁদ বা মহাকাশের অন্যান্য অংশে প্রভাব বিস্তারের দৌড় চলছে। চীনা সংবাদমাধ্যমে এটিকে তুলনা করা হয়েছে ইউরোপের ঐতিহাসিক ভূমি দখলের সঙ্গে, যেখানে শক্তিশালী দেশগুলো দুর্বলদের সম্পদ কুক্ষিগত করত।

চীনের আরও একটি বড় আপত্তি হলো, এই আকর্ডস জাতিসংঘ-এর মাধ্যমে না হয়ে, এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, মহাকাশ একটি উন্মুক্ত সম্পদ, এবং একে পরিচালনা করার নিয়ম-কানুন আসা উচিত জাতিসংঘের মতো নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ফোরাম থেকে—না যে একটি দেশের ইচ্ছেমতো। এছাড়া, চীন এটাকে কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ু যুদ্ধের মতো প্রতিযোগিতা বলেও ব্যাখ্যা করেছে। তাদের ভয়, এর ফলে মহাকাশের জন্য যে বৈশ্বিক সহযোগিতার স্বপ্ন দেখা হচ্ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তবে সব দিক বিবেচনায়, আর্টেমিস আকর্ডসে বাংলাদেশের যোগদান কেবল একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়—এটি ভবিষ্যতের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পেতে পারে, যা দেশের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সহায়ক হবে। বিশেষত, স্পারসোর মতো প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য এটি একটি বড় সুযোগ—নাসা ও অন্যান্য মহাকাশ সংস্থার সঙ্গে যৌথ গবেষণা, স্যাটেলাইট উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মনিটরিং, এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি ব্যবহারের মতো ক্ষেত্রগুলোতে অগ্রগতি সম্ভব।

তবে এই পথ সহজ নয়। বাংলাদেশকে এই চুক্তির সুযোগগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে দক্ষতা অর্জন। এই চুক্তির সুফল পেতে হয়তো আগামী ২০-২৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। অবশেষে, আর্টেমিস আকর্ডস বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার জানালা—যা সঠিকভাবে ব্যবহৃত হলে, দেশের মহাকাশ গবেষণায় একটি নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে পারে।

লেখক: রেদোয়ানুল হক রানা
সুত্রঃ নাসা, প্রথম আলো, স্পেস, দ্য কনভারসেশন

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply