ভাবুন তো, এমন এক প্রাণী—যার চেহারা গন্ডার আর সমুদ্রের উটপাখির মাঝামাঝি। সরু মাথা, পেশিবহুল লম্বা লেজ, আর চারটি মজবুত পা, যার আঙুলে ক্ষুদ্র খুর এবং পায়ে জালার মতো পর্দা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রায় ৪৩ মিলিয়ন বছর আগে আধুনিক তিমির পূর্বপুরুষরা দেখতে এমনই ছিল—পৃথিবীর জল ও স্থল, দুই জায়গাতেই দিব্যি চলাফেরা করত তারা। এই তথ্য এসেছে একটি নতুন গবেষণা থেকে। গবেষকরা পেরুর উপকূলে একটি প্রাচীন চারপায়ের তিমির অমূল্য জীবাশ্ম খুঁজে পেয়েছেন। ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল “কারেন্ট বায়োলজি” নামক বৈজ্ঞানিক জার্নালে এই আবিষ্কারের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণায় যুক্ত নন এমন এক বিবর্তনবিদ এবং অ্যানাটমিস্ট, নিউ ইয়র্ক ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির জোনাথন গেইসলার বললেন,
“এ ধরনের আবিষ্কার আমাদের জানান দেয় আমরা আসলে কত কম জানি। সেটাই সবচেয়ে রোমাঞ্চকর।”

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, পেরুর উষর উপকূলীয় এলাকায় খনন চালাচ্ছেন জীবাশ্মবিদরা। অনেক প্রাচীন সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীর জীবাশ্ম বেরিয়ে এসেছে। গবেষক অলিভিয়ার ল্যাম্বার্ট বলেন, তিনি ভেবেছিলেন—আর কিছু হয়তো অবশিষ্ট নেই। ঠিক তখনই তারা একটি বড় দাঁতসহ চোয়ালের খণ্ড খুঁজে পান। সেখান থেকে শুরু হয় খননের নতুন অধ্যায়।
ল্যাম্বার্ট বলেন ,
“যখন প্রথম হিন্দ লিম্ব—মানে পশ্চাৎপদ, ফিমার, গোড়ালির হাড় দেখতে পেলাম, সেটি ছিল এক অসাধারণ মুহূর্ত। আমরা সবাই খুবই উত্তেজিত ছিলাম।”
যদিও এসব হাড় কয়েক মিলিয়ন বছর পুরোনো এবং অনেকখানি ভাঙা, তবু তারা চমৎকারভাবে সংরক্ষিত ছিল। আশপাশের গাদাগাদা পলিমাটির মধ্যে সেগুলো চোখে পড়ে সহজেই। “এজন্য খনন ছিল বেশ আনন্দদায়ক। একের পর এক হাড় বের হচ্ছিল, যেন একেকটা চমক!”
গবেষকেরা দেখেছেন, তিমিটির আঙুল ও পায়ের পাতায় ছোট ছোট খুর ছিল। কঙ্কাল একত্র করলে দেখা যায়, তার নিতম্ব এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিল স্থলচর প্রাণীর মতো। কিন্তু তার লম্বা হাত-পা আর বড় লেজের হাড় ছিল অনেকটা ওটারের মতো, যা স্পষ্ট করে দেয়—এটি পানিতে দক্ষভাবে সাঁতার কাটতে পারত।ল্যাম্বার্ট বলেন, “তারা (তিমি) তখনও স্থলে চলাফেরায় সক্ষম ছিল, আবার একই সঙ্গে লেজ ব্যবহার করে সাঁতারে দক্ষ হয়ে উঠছিল।” এই হাঁটাহাঁটি আর সাঁতার কাটা দুই-ই পারা তিমির নতুন প্রজাতিটির নাম দেওয়া হয়েছে Perefocetus pacificus, যার অর্থ “প্রবাসী তিমি যে প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছেছিল।”

ল্যাম্বার্ট বলেন, কারণ এটি হলো প্রথম চার পায়ের তিমির জীবাশ্ম যা প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ গোলার্ধে পাওয়া গেছে, তাই এই আবিষ্কার প্রাচীন তিমিদের বিস্তারের মানচিত্রে এক বিশাল সংযোজন।” এর আগে বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন, তিমির পূর্বপুরুষরা প্রথমে আফ্রিকা থেকে উত্তর আমেরিকায় গিয়েছিল, তারপর দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই জীবাশ্মের সময়কাল ও অবস্থান দেখে ল্যাম্বার্ট ও তাঁর সহ-গবেষকরা মনে করছেন—তারা প্রথমে দক্ষিণ আটলান্টিক পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় আসে, তারপর উত্তর আমেরিকাসহ পৃথিবীর অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
গেইসলার বলেন,
এটা যুক্তিযুক্ত মনে হয় তবে প্রশান্ত মহাসাগরের চারপাশে এই ধরনের তিমির আরও জীবাশ্ম খুঁজে দেখতে হবে। হতে পারে তারা প্রশান্ত মহাসাগরই পার হয়েছে। এখনো আমরা জানি না তারা পানিতে কতটা দক্ষভাবে চলাফেরা করতে পারত। তিনি আরও বলেন, তারা যে এত প্রাচীন ও মৌলিক গঠন নিয়েও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে, সেটাই তো অবাক করার মতো ব্যাপার। এটা সত্যিই দারুণ একটা জীবাশ্ম, যা এক অসাধারণ ইতিহাস রচনা করে।”
এই আবিষ্কার কেবল একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান নয়, বরং তিমির বিবর্তনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উন্মোচন করেছে। এর থেকে বোঝা যায়, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ীদের বিবর্তন ও বিশ্বব্যাপী বিস্তারের কাহিনী হয়তো আমরা যতটা ভেবেছি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল!
লেখকঃ ইমাম হোসাইন আনজির
সূত্রঃ বিবিসি, লাইভ সাইন্স

