মানুষ বা আমাদের পূর্বপুরুষরা কখন প্রথম গান গাইতে শুরু করেছিল, সেটা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। গান তো ফসিল হয়ে থাকে না, আবার খুব একটা প্রমাণও রেখে যায় না—বিশেষ করে যতদিন না লিখিত সঙ্গীত বা অডিও রেকর্ডিং আবিষ্কৃত হয়েছিল। তাই আমাদের হাতে কেবল একটা আনুমানিক সময় বলার সুযোগ আছে, যে সময়ে গান গাওয়া শুরু হয়েছিল। ঠিক কেন আমাদের পূর্বপুরুষরা গান গাইতে শুরু করেছিল সেটাও বলা কঠিন, তবে কিছু ভালো থিওরি আছে।
প্রথম যে বাদ্যযন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা হলো প্রায় ৪০,০০০ বছর আগের হাড়ের বাঁশি, আর এই বাঁশি যেই গুহা থেকে পাওয়া গেছে, সেখানে নাচছে এমন মানুষের ছবিও আঁকা আছে। কিন্তু তার আগেই মানুষ সম্ভবত গান আর নাচ করতো, যদিও তখনও তারা বাদ্যযন্ত্র বানায়নি বা গুহার দেয়ালে আঁকেনি। বানরের উপর গবেষণায় দেখা গেছে, তারা গানের মতোভাবে গলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আর আমরা যে গান গাইতে পারি, এই ক্ষমতাটা এসেছে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ বছর আগে।
মাথা আর চোয়ালের ফসিল দেখে বোঝা যায়, প্রায় ১০ লাখ বছর আগে কিছু হোমিনিন সম্ভবত গলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতো, তাই তারা গান গাইতে পারতোও বটে—তবে এটা নিশ্চিত নয়। সুতরাং সবচেয়ে ভালো অনুমান হলো, গান আমাদের মধ্যে শুরু হয়েছে গত ১০ লাখ থেকে ৪০ হাজার বছরের মধ্যে। এখন তো দেখা যায়, সব আধুনিক সংস্কৃতিতেই গান আছে, যদিও সুরের ধরণ আলাদা আলাদা।
কেন আমরা গান গাইতে শুরু করেছিলাম?
চার্লস ডারউইন যখন তার যৌন নির্বাচনের তত্ত্ব দেন, তখন থেকেই এই প্রশ্নে অনুমান করা হচ্ছে, আর তিনি বলেছিলেন গান গাওয়া মানুষের ক্ষেত্রে পাখিদের মতোই যৌন নির্বাচনের জন্য হতে পারে। পরবর্তীতে রবিন ডানবার নামের এক গবেষক (যিনি “ডানবার নম্বর” দিয়েছিলেন মানে একজন মানুষ সাধারণত ১৫০ জনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে), তিনি বলেন, গান আর নাচ মানুষকে একসাথে অনেকের সঙ্গে বন্ধন গড়ে তুলতে সাহায্য করে, যেটা আমাদের দলগুলোকে অন্য প্রজাতির তুলনায় অনেক বড় করেছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, গান গাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাবা-মা আর বাচ্চাদের মধ্যে বন্ধন তৈরি করা।
এ ধরনের “ইনফ্যান্ট-ডিরেকটেড স্পিচ”, বা যাকে বলে “প্যারেন্টিজ”, সেখানে কথার মধ্যে সুর আর ছন্দ বেশি থাকে। এটাকে গান বলা যায় কিনা সেটা নিয়েও বিতর্ক আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখনো আমরা পুরো মানব বিবর্তনের ইতিহাস ল্যাবে বসে দেখতে পারি না, তাই আসল কারণটা জানা সম্ভব নয়। তবে এটা বিশ্বাসযোগ্য যে গান আর ভাষা দুটোই এসেছে একটা “প্রোটো-মিউজিকাল ল্যাঙ্গুয়েজ” থেকে, যেটা প্রথমে শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো, পরে সেটা বড়দের সঙ্গেও যোগাযোগের মাধ্যম হয়—দলগতভাবে বা রোমান্টিক সঙ্গীদের সঙ্গে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : New Scientists

