একবার ঢাকার ব্যস্ত কোনো রাস্তার কথা ভাবুন। চারদিকে গাড়ির হর্ন, মানুষের কোলাহল আর ইঞ্জিনের গগনবিদারী গর্জন। এমন একটি নরকতুল্য পরিবেশে আপনি কানজুড়ে পরে নিলেন আপনার শখের Active Noice Cancelling (ANC) হেডফোনটি। ছোট্ট একটি বোতাম চাপতেই যেন জাদুমন্ত্রের মতো চারপাশের পৃথিবীটা একদম চুপ হয়ে গেল! মনে হলো যেন জাদুর গালিচায় চড়ে আপনি মুহূর্তের মধ্যে অন্য কোনো শান্ত গ্রহে এসে পড়েছেন। কিন্তু এই পরম শান্তির রেশ কাটতে না কাটতেই আপনার মনে হতে পারে, কানের ভেতরে কেমন যেন একটা গুমোট চাপ তৈরি হচ্ছে। অনেকটা বিমানে করে উড্ডয়নের সময় কিংবা দ্রুতগামী লিফটে করে বহুতল ভবনের ওপরে ওঠার সময় ঠিক যেমনটা অনুভূত হয়। এই অস্বস্তিকর মাথাব্যথা বা কানের ভেতরের শূন্যতার অনুভূতিটা আসলে কোত্থেকে আসে? নিছক শান্তির জন্য কেনা একটি যন্ত্র কেন উল্টো আমাদের মস্তিষ্কে বিভ্রান্তি তৈরি করে?

এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে হলে আমাদের একটু শব্দের বিজ্ঞানের দিকে তাকাতে হবে। শব্দ মূলত কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি এক ধরনের তরঙ্গ বা ঢেউ যা বাতাসের ভেতর দিয়ে আমাদের কানে এসে পৌঁছায়। পুকুরের স্থির পানিতে ঢিল ছুঁড়লে যেমন চারদিকে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, শব্দও ঠিক তেমনি বাতাসের অণুগুলোকে ধাক্কা দিয়ে এগিয়ে চলে। এখন প্রশ্ন হলো, নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন কীভাবে এই ঢেউগুলোকে থামায়? অনেকেই হয়তো ভাবেন, এই হেডফোনগুলো কানের চারপাশে এমন একটি দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করে যা ভেদ করে শব্দ ভেতরে ঢুকতে পারে না। ধারণাটি আংশিক সত্য হলেও, আসল রহস্যটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। হেডফোনের ভেতরে থাকা ক্ষুদ্র মাইক্রোফোনগুলো সারাক্ষণ বাইরের কোলাহল শুনতে থাকে। এরপর ভেতরের স্মার্ট চিপটি সেই বাইরের শব্দের ঠিক উল্টো বা বিপরীতমুখী আরেকটি শব্দতরঙ্গ তৈরি করে কানের ভেতরে পাঠিয়ে দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Destructive Interference বা ধ্বংসাত্মক ব্যতিচার। যখন একটি ঢেউয়ের চূড়ার সাথে বিপরীতমুখী আরেকটি ঢেউয়ের খাদের সংঘর্ষ হয়, তখন তারা একে অপরকে বাতিল করে দেয়। ফলাফল? একদম পিনপতন নীরবতা!

যদি বাইরের শব্দ আর ভেতরের উল্টো শব্দ মিলে শূন্যই হয়ে যায়, তাহলে কানে অহেতুক চাপ লাগবে কেন? এখানেই আসে আমাদের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের চমৎকার একটি খেলা। আমাদের মস্তিষ্ক লাখ লাখ বছর ধরে কিছু নির্দিষ্ট সংকেত পড়তে অভ্যস্ত। সাধারণত, পরিবেশের নিম্ন-কম্পাঙ্কের বা লো-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দগুলো যখন হঠাৎ করে গায়েব হয়ে যায়, তখন আমাদের আদিম মস্তিষ্ক ধরে নেয় যে পারিপার্শ্বিক বায়ুমণ্ডলের চাপে নিশ্চয়ই কোনো বিশাল পরিবর্তন এসেছে। পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে বা বিমানে থাকলে ঠিক এমনটাই ঘটে, বায়ুর চাপ কমে যায় এবং চারপাশের শব্দের ধরনে পরিবর্তন আসে। আপনার নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন যখন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আশপাশের এসি মেশিনের শব্দ বা গাড়ির ইঞ্জিনের গোঙানির মতো বিরক্তিকর শব্দগুলো পুরোপুরি গায়েব করে দেয়, তখন আপনার কানের পর্দা সেই চেনা নিম্ন-কম্পাঙ্কের শব্দগুলো আর শুনতে পায় না।

এই অপ্রত্যাশিত নৈঃশব্দ্য আপনার মস্তিষ্কের জন্য এক বিশাল ধাঁধার জন্ম দেয়। আপনার চোখ মস্তিষ্ককে বলছে যে আপনি সোফায় স্থির হয়ে বসে আছেন। আপনার কানের ভেতরের ভারসাম্য রক্ষাকারী অঙ্গ বা ভেস্টিবুলার সিস্টেম বলছে যে পরিস্থিত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আছে। অথচ আপনার শ্রবণতন্ত্র বলছে যে চারপাশে নিম্ন-কম্পাঙ্কের কোনো শব্দ নেই, তার মানে বায়ুর চাপ নিশ্চয়ই আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে! এই পরস্পরবিরোধী তথ্যগুলো যখন মস্তিষ্কের সদর দপ্তরে পৌঁছায়, তখন মস্তিষ্ক ভয়ানক বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে ধরে নেয় কানের ভেতরে এবং বাইরের বায়ুর চাপের মধ্যে একটি অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। ফলে সে আপনাকে সতর্ক করার জন্য কানের ভেতর এক ধরনের কাল্পনিক চাপের অনুভূতি তৈরি করে। অর্থাৎ, আপনি কানের ভেতর যে ভারি অনুভূতি বা চাপ অনুভব করছেন, তা আসলে বাস্তবের কোনো বাতাসের চাপ নয়। এটি আপনার বিভ্রান্ত মস্তিষ্কের তৈরি করা নিছকই একটি Psychoacoustic Illusion।

এই অদ্ভুত বিভ্রমের কারণেই দীর্ঘক্ষণ নয়েজ ক্যানসেলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অনেকের মাথা ভারী হয়ে আসে কিংবা সামান্য বমি বমি ভাব হয়। তবে এর মানে এই নয় যে প্রযুক্তিটি আমাদের জন্য ক্ষতিকর বা ব্যবহার করা উচিত নয়। বরং প্রচলিত ইয়ারফোনের তুলনায় এর স্বাস্থ্যগত সুবিধাও নেহাত কম নয়। বাসের প্রচণ্ড শব্দ বা রাস্তার কোলাহল এড়াতে সাধারণ হেডফোনে আমরা বাধ্য হয়েই ভলিউম বাড়িয়ে দিই, যা আমাদের কানের ভেতরের সংবেদনশীল কোষ বা হেয়ার সেলগুলোর জন্য ভয়ানক ক্ষতিকর। অন্যদিকে, ANC প্রযুক্তি থাকায় বাইরের কোলাহল এমনিতেই কমে যায়, তাই খুব অল্প ভলিউমেই আমরা গানের প্রতিটি সূক্ষ্ম নোট বা পডকাস্টের কথাগুলো স্পষ্টভাবে শুনতে পাই। এটি আমাদের শ্রবণশক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত রাখতে চমৎকার ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সমস্যা হলো, টানা অনেকক্ষণ এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কানের এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়। কারণ, আপনি হয়তো নীরবতা উপভোগ করছেন, কিন্তু আপনার হেডফোনের স্পিকার সারাক্ষণই বাইরের শব্দের বিপরীতে অবিরাম শব্দতরঙ্গ বা অ্যান্টি-নয়েজ ফায়ার করে চলেছে। এই অবিরত তরঙ্গ প্রবাহ আপনার কানের পর্দাকে ক্রমাগত ব্যস্ত রাখে, যা থেকে একসময় ক্লান্তি আসাটা খুবই স্বাভাবিক।

নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন ব্যবহার করা একদম ছেড়ে দিতে হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রতিটি প্রযুক্তিরই নিজস্ব একটি ভাষা থাকে, আর সেই ভাষাটি বুঝতে পারলেই এর সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব। একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই প্রযুক্তি ব্যবহার না করে, মাঝে মাঝে হেডফোন খুলে কানকে একটু বিশ্রাম দেওয়া যেতে পারে। ভলিউম সবসময় পরিমিত মাত্রায় রাখা এবং নিজের কানের আকারের সাথে মানানসই, আরামদায়ক ফিটিংয়ের হেডফোন নির্বাচন করাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় অতিরিক্ত টাইট হেডফোন কানের আশপাশের রক্তনালীতে চাপ ফেলে মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। আগামী দিনের প্রযুক্তি হয়তো এতটাই উন্নত হবে যে, আমাদের মস্তিষ্ক আর এই সাইকোঅ্যাকোস্টিক বিভ্রমের ফাঁদে পা দেবে না। অ্যালগরিদমগুলো হয়তো আরো মসৃণভাবে শব্দের ক্যানভাস তৈরি করবে। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত, আধুনিক বিজ্ঞানের এই জাদুকরী নীরবতাকে উপভোগ করার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের শরীর ও মস্তিষ্কের কথাও কিছুটা মাথায় রাখতে হবে। কারণ দিনশেষে, আমরা যতই প্রযুক্তিনির্ভর হই না কেন, আমাদের শরীর এখনো প্রকৃতির সেই লাখো বছর পুরোনো ছন্দেই স্পন্দিত হয়।

তথ্যসুত্রঃ PMC, Frontiers

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments