৩৯৯ খ্রিস্টপূর্ব সালে সক্রেটিসের বিচারটা ছিল এমন এক সময়ের ঘটনা, যখন এথেন্স শহর ভীষণভাবে হতাশা, রাগ আর বিভ্রান্তির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, গোটা সমাজ যেন একসাথে ক্ষোভ আর দুশ্চিন্তার বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। শহরটি তখন একটা বড় যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলো—পেলোপনেশীয় যুদ্ধে স্পার্টার কাছে পরাজিত হয়ে এথেন্স তার ক্ষমতা, গৌরব আর সাম্রাজ্য সব হারিয়ে ফেলে। তাদের গণতন্ত্রও কয়েকবার ভেঙে পড়েছিল, ফলে মানুষজন ছিল রীতিমতো ভীত ও অস্থির।

এই ভয় আর অনিশ্চয়তার সময়ে সক্রেটিসের মতো একজন মানুষ—যিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে লোকজনকে প্রশ্ন করতেন, তাঁদের বিশ্বাস আর যুক্তিগুলো চ্যালেঞ্জ করতেন ফলে তাঁকে অনেকেই অস্বস্তিকর আর বিপজ্জনক মনে করতে শুরু করল। তাঁর চিন্তার ধারা অনেকের কাছে অদ্ভুত বা বিরক্তিকর মনে হচ্ছিল।

তখনকার সমাজ এমন একজন “দোষী” খুঁজতেছিল, যার ওপর তারা তাদের ক্ষোভ, ভয় আর ব্যর্থতার বোঝা চাপাতে পারে। আর সক্রেটিস, যিনি ছিলেন বয়সে বড়, খোলামনে প্রশ্ন করতেন, কারো কাছে মাথা নত করতেন না—তাঁকেই তারা বেছে নিল “সমস্যার মূল” বলে। অথচ তিনি কোনো অস্ত্রধারী বিদ্রোহী ছিলেন না, শুধু একজন প্রশ্নকর্তা।

এভাবেই, এক বিপর্যস্ত, দিশেহারা সমাজ তাদের রাগ মেটানোর জন্য একজন নিরীহ দার্শনিককে শাস্তি দেয়। সক্রেটিসের বিচার ছিল আসলে সেই সমাজের গভীর দুশ্চিন্তা আর আত্মসমালোচনার এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ। 

সক্রেটিস হেমলক বিষ পান করেছিলেন, আর এইভাবে নিজের মৃত্যুকে তিনি এমন এক জিনিসে পরিণত করেছিলেন, যা তাঁর জীবনের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। তবে যে প্রশ্নটা গত দুই হাজার বছর ধরে ইতিহাসবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে, তা হলো: এই অদ্ভুত গ্রিক দার্শনিক কি সত্যিই এতটাই বিপজ্জনক ছিলেন যে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যুক্তিযুক্ত ছিল, না কি এথেন্স শুধু তার বিশাল পতনের জন্য কাউকে দায়ী করতে চেয়েছিল?

পেলোপনেশীয় যুদ্ধের পর দুর্দশার মুখে পড়ে অ্যাথেন্স, আর তখন শহরের এই সংকটের জন্য সক্রেটিসকেই দায়ী করে তাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়। এই ঘটনার স্মরণে তৈরি ‘দ্য সক্রেটিস অ্যাড্রেস’ চিত্রকর্মটি আঁকেন লুইস জোসেফ লেব্রুন, ১৮৬৭ সালে। Image Credit : Public Domain via Wikimedia Commons

এথেন্স নিজের যে বিশৃঙ্খলা নিজেই তৈরি করেছিল

৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বে এথেন্স এক চরম সঙ্কটে ছিল—পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধে লজ্জাজনকভাবে পরাজয়ের পাঁচ বছর পরে তারা তাদের সাম্রাজ্য এবং ভূমধ্যসাগরে নৌ-ক্ষমতা—দুটোই হারিয়ে বসেছিল। শহরটির গণতন্ত্রও দু’বার ধ্বংস হয়েছিল অভিজাত শ্রেণির হাতে, যার মধ্যে ছিল ৪০৪ ও ৪০৩ খ্রিস্টপূর্বে ‘থার্টি টাইরেন্টস’-এর শাসন। এটি ছিল সেই শহরের জন্য এক বড় ধাক্কা, যা একসময় গণতন্ত্রের জন্মদাতা হিসেবে পরিচিত ছিল।

সক্রেটিস তখন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন কারণ তাঁর কিছু পরিচিত ব্যক্তি গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। তাঁর ছাত্র আলসিবিয়াডিস— উদাহরণস্বরূপ, যুদ্ধে এথেন্স এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন এবং ক্রিটিয়াস যিনি প্রাচীন এথেন্সের একজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, লেখক এবং সক্রেটিসের ঘনিষ্ঠ শিষ্যদের একজন ছিলেন এবং সাথে থার্টি টাইরেন্টসদের একজন নেতাও।

যদিও সক্রেটিস নিজে এথেন্সে থেকে গিয়েছিলেন এবং কিছু আদেশ অমান্যও করেছিলেন থার্টি টাইরেন্টসদের বিরুদ্ধে, কিন্তু তাঁর সঙ্গীদের কারণে সাধারণ মানুষ ধরে নেয় যে তিনি গণতন্ত্র ধ্বংসের চক্রান্তে জড়িত ছিলেন।

তার উপর, এথেনিয়রা বিশ্বাস করত যে তাদের সামরিক পরাজয় ছিল দেবতাদের রাগের ফল। তাই সক্রেটিস যখন প্রকাশ্যে প্রথাগত ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন, তখন সেটা সাধারণ মানুষের চোখে বিপজ্জনক ঠেকত—যেন তাঁর এসব কথা তাদের দুর্ভাগ্যের কারণ!

সক্রেটিসের একটা খ্যাতি ছিল, তিনি যাঁদের সবাই শ্রদ্ধা করত, তাঁদের তাঁর প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির মাধ্যমে বোকা বানিয়ে দিতেন। সেই সময়ের আতঙ্কিত সমাজে এই বিষয়টা মানুষের মধ্যে আরও সন্দেহ ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। শেষমেশ, এইসব কারণেই তাঁকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

কীভাবে সক্রেটিসকে বিচারসভায় তোলা হয়েছিল

মেলেটাস, আনাইটাস আর লাইকন যারা সক্রেটিসের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে দুটো অভিযোগ আনেন—দেবতাদের প্রতি অবমাননা এবং তরুণ সমাজকে বিপথে পরিচালনা। এই ধর্মীয় ধরনের অভিযোগগুলো আসলে ছিল রাজনৈতিক অস্ত্র, যেগুলোকে সমাজের নৈতিক উদ্বেগের ছদ্মবেশে ব্যবহার করা হয়েছিল যেন তারা দেবতাদের অনুগ্রহ ফেরত পেতে পারে।

দেবতাদের প্রতি অবমাননার অভিযোগ ছিল, সক্রেটিস এথেন্সের অফিসিয়াল দেবতাদের অস্বীকার করেছেন এবং নতুন দেবতা নিয়ে এসেছেন। সম্ভবত এটা তাঁর “ডায়মনিয়ন” নামের অন্তর্দৃষ্টির কথাই বোঝাতে বলা হয়েছিল যা এক ধরনের অন্তর্নিহিত কণ্ঠস্বর, যেটাকে সক্রেটিস বলতেন তাঁর পথপ্রদর্শক। যদিও তিনি ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতেন এবং দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতেন, তাঁর অনবরত প্রশ্ন করার অভ্যাসটাই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের মতে ধর্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে দেওয়ার কারণ।

তরুণদের নষ্ট করার অভিযোগটা ছিল আসলে আরও বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রসূত। অভিশংসকেরা বলেছিলেন, যেসব দেশদ্রোহী যেমন আলসিবিয়াডিস বা একনায়ক ক্রিটিয়াস—তাঁদের সঙ্গে সক্রেটিসের সম্পর্ক ছিল, আর তাঁর যে প্রশ্নোত্তরের পদ্ধতি, সেটা নাকি তরুণদের মধ্যে কর্তৃপক্ষ আর গণতন্ত্রের প্রতি অবজ্ঞা তৈরি করত, যার ফলে নাকি তৈরি হচ্ছিল এক প্রজন্মের গণতন্ত্রবিরোধী মানুষ।

এই অভিযোগগুলো একটা যুক্তিগত বিভ্রান্তির জন্ম দেয়—সক্রেটিস চিন্তা করার স্বাধীনতা আর প্রশ্ন করার অভ্যাস ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন, যা আসলে সচেতন নাগরিক গড়ে তোলে এবং গণতন্ত্রকে মজবুত করার কথা। অথচ অভিযোগকারীরা বলছিলেন এই প্রশ্ন করার অভ্যাসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা কমিয়ে দিয়েছে এবং শেষমেশ গণতন্ত্রের পতনের কারণ হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর অস্পষ্টতা তাদেরকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল—যেমন ‘তরুণদের নষ্ট’ করার মতো বিষয় কখনোই চূড়ান্তভাবে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা সম্ভব নয়, ফলে সক্রেটিস পড়ে গিয়েছিলেন এক এমন অবস্থায় যেখানে জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

Image Credit: John le Farge, Wikimedia Commons, CC BY 1.0

সক্রেটিস ও তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থন

সক্রেটিস যদি নিজেকে বাঁচাতে চাইতেন, তাহলে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের কৌশলটা ছিল ভয়াবহভাবে ব্যর্থ। সাধারণত তখনকার এথেন্সের আদালতে কাঁদতে থাকা আত্মীয়স্বজনদের হাজির করা হতো, নিজেদের পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো, আবেগ দিয়ে বিচারকদের মন গলানোর চেষ্টা করা হতো—কিন্তু সক্রেটিস বরং তাদের সামনে দাঁড়িয়ে একটা দর্শনের ক্লাস দিয়ে ফেললেন।

প্লেটোর লেখা “অ্যাপলোজি” বইতে যেটা বলা আছে, তাতে বোঝা যায় সক্রেটিস যেন ইচ্ছা করেই নিজের অহংকারী ভাবমূর্তিকে আরও নিশ্চিত করছিলেন। ক্ষমা চাওয়ার বদলে, তিনি বললেন যে তাঁকে জনগণের খরচে বাকি জীবনটা লালন-পালন করা উচিত, যেমনটা অলিম্পিক বিজয়ীদের করা হয়। যদিও এই তুলনাটা পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়—কারণ তিনি সত্যিই বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান একজন ক্রীড়াবিদ থেকে অনেক বেশি জাতির উপকারে আসে—তবুও এই কথা বলার সময়টা ছিল খুবই ভুল।

তিনি যখন বললেন, “যে জীবন বিশ্লেষণ করা হয়নি, তা আসলে বেঁচে থাকার যোগ্য নয়,” তখন এটা তার কাছে মহান মনে হলেও, বিচারকদের কাছে মনে হয়েছিল তিনি বুঝি তাঁদের জীবনকেই তুচ্ছ বলছেন। এরপর যখন তিনি বললেন যে তিনি তাঁর দার্শনিক কাজ চালিয়েই যাবেন, এমনকি যদি বেকসুর খালাস পান। তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে আসলে তিনি নিজের কোনো আচরণই বদলাবেন না।

সক্রেটিসের বিরুদ্ধে যে দুইটি অভিযোগ আনা হয়েছিল—

১) দেবতাদের অবমাননা করা,

২) তরুণদের ভুল পথে চালনা করা—

এই অভিযোগগুলো নিয়ে এথেন্সের আদালতে বিচার হয়েছিল, আর সেই বিচারে ভোটাভুটি হয়। প্রায় ৫০০ জন ভোট দেন, আর ফলাফলে ২৮০ জন বলেন দোষী, আর ২২০ জন বলেন নির্দোষ।

যদি তিনি অন্যরকম কোনো বক্তব্য দিতেন, তাহলে হয়তো কিছু বিচারকের মন পরিবর্তিত হতো এবং তিনি বেঁচে যেতেন। কিন্তু যখন তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প সাজা প্রস্তাব করতে বলা হলো, তখন তিনি যে “গণসম্মান” পাওয়ার কথা বললেন, তা এতটাই বিচারকদের রাগালো যে মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত ভোটে ব্যবধান আরও বেড়ে গেল।

তাহলে সক্রেটিস কি আসলেই বিপজ্জনক ছিলেন?

এই প্রশ্নটাই হলো সেই “এক মিলিয়ন ড্রাকমা” প্রশ্ন—কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর আজও মেলেনি, যদিও দু’হাজার বছরেরও বেশি সময় কেটে গেছে সেই দিন থেকে, যেদিন এই ব্যতিক্রমী গ্রিক দার্শনিককে আদালতে দাঁড় করানো হয়েছিল। সক্রেটিস নিঃসন্দেহে একটা “বাধা” হিসেবে কাজ করতেন—তিনি জনসমক্ষে প্রমাণ করে দিতেন, যে সব সম্মানিত নেতা আর শিক্ষকেরা নিজেকে জ্ঞানী বলে দাবি করেন, তাঁদের আসলে কিছু জানা নেই। কিন্তু এমন প্রশ্ন করার অভ্যাস আসলে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করারই কথা—কারণ এতে নাগরিকরা কম আনুগত্যপূর্ণ হয়ে আরও চিন্তাশীল হয়।

তবে সব কিছুর মূল কারণ ছিল সময়টা—কারণ সক্রেটিসের বিচার যখন হয়, তখন এথেন্স ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত, পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধে পরাজিত হয়ে। আর এই হারে বিধ্বস্ত শহর তখন খুঁজছিল কাউকে, যাকে দোষী বলে ঠেলে দেওয়া যাবে। ইতিহাস বলে, বিপদের সময় সমাজ সবসময় কোনো “সহজ টার্গেট” খোঁজে—অর্থনৈতিক মন্দায় যেমন অভিবাসীদের দোষ দেওয়া হয়, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিরতায় তৈরি করা হয় কল্পিত শত্রু। সক্রেটিস ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি আগেই ছিলেন একটু আলাদা, সবকিছু প্রশ্ন করতেন, ফলে এই গল্পে তিনি ছিলেন একদম ফিট।

ঘটনার পরে যা দেখা গেল, তাতে প্রমাণ হয় পুরো বিচার প্রক্রিয়াটাই ছিল একটা সাজানো ব্যর্থতা—কারণ এতে এথেন্সের কেবল দীর্ঘস্থায়ী লজ্জা হয়েছে, আর সক্রেটিস পেয়ে গেছেন এক ধরনের অমরত্ব, বিশেষ করে তাঁর ছাত্র প্লেটোর মাধ্যমে।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষক বলছেন, বাস্তবের সক্রেটিস হয়তো রাজনীতির দিক থেকে আরও বেশি বিতর্কিত ছিলেন, যেটা আমরা আগে ভেবেছি তার চেয়েও। তবুও, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ছিল অস্পষ্ট, আর প্রমাণগুলোও ছিল অনেকটাই অনুমাননির্ভর।

এই পুরো ব্যাপারটাই আজকের দিনের কিছু অস্বস্তিকর মিল তুলে ধরে। এখনো আমরা “ডি-প্ল্যাটফর্মিং,” “ক্যানসেল কালচার,” আর “একাডেমিক ফ্রিডম” নিয়ে তর্ক করি—যা প্রমাণ করে আমরা এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারি না কীভাবে এমন কণ্ঠস্বরকে সামলাতে হবে, যারা আমাদের বিশ্বাস আর ক্ষমতাবানদের অবস্থান চ্যালেঞ্জ করে। আসল শিক্ষা হচ্ছে—এটা শুধু সক্রেটিস কতটা বিপজ্জনক ছিলেন সেটা নয়, বরং এটা যে, কোনো সমাজ—আমাদের সমাজসহ—আসলে কতটা সক্ষম তাদের নিজস্ব বিশ্বাস আর আরামদায়ক কল্পনার মুখোশ খুলে ফেলতে।

লেখকঃ ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্য সূত্রঃ Greek Reporter

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments