আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, বস্তুটি স্থির পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে গতির দিকে চ্যাপ্টা বা সংকুচিত দেখাবে। এই ঘটনাকে বলা হয় ‘লরেঞ্জ সংকোচন’। অর্থাৎ, বস্তুটি পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে বাস্তবেই ছোট হয়ে যায়, কেবল দৃষ্টিভ্রম নয়।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, আমরা আসলে দেখবো ভিন্ন কিছু। ১৯৫৯ সালে গণিতবিদ রজার পেনরোজ এবং পদার্থবিদ জেমস টেরেল দেখান, কোনো দ্রুতগামী বস্তুকে চ্যাপ্টা নয়, বরং খানিকটা ঘূর্ণিত অবস্থায় দেখতে পাবো।
এর কারণ, বস্তুর বিভিন্ন অংশ থেকে আলো আমাদের চোখে পৌঁছাতে ভিন্ন ভিন্ন সময় নেয়। এই সময়ের পার্থক্যের কারণে, আমাদের চোখ বা ক্যামেরা যখন একই মুহূর্তে সেই সব আলোকরশ্মি ধরে, তখন মস্তিষ্ক সেটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে যেন বস্তুটি একটু ঘুরে গেছে। এই ভিজ্যুয়াল প্রভাবই টেরেল-পেনরোজ ইফেক্ট নামে পরিচিত। এই ঘটনা একটি অপটিক্যাল ইলিউশন।
ধরুন, আপনার দিকে একটি দ্রুতগামী ট্রেন ছুটে আসছে। ট্রেনের পেছন থেকে আলোকরশ্মি আপনার চোখে পৌঁছাতে সামনের অংশের আলোর চেয়ে বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। এই সামান্য সময় পার্থক্যই ছবিটিকে বিকৃত করে দেয়।
যেহেতু আপনার চোখ বা ক্যামেরা বস্তুর সামনের এবং পেছনের অংশ একই সাথে দেখছে, তাই মস্তিষ্ক এই তথ্যটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করে যেন ট্রেনটা ঘুরে আছে। এর ফলে আপনি বস্তুর পাশের এমনকি পেছনের অংশও দেখতে পাবেন।
অর্থাৎ, যা বাস্তবে ঘটছে (সংকোচন) আর যা আমরা চাক্ষুষ দেখছি (ঘূর্ণন), এ দুটো এক নয়।
এই তত্ত্বটি প্রায় ৬০ বছর ধরে কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। কারণ কোনো বস্তুকে আলোর গতিতে ছুটিয়ে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু সম্প্রতি ভিয়েনার একদল বিজ্ঞানী এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন এক দারুণ কৌশলে। তাঁরা কোনো বস্তুকে আলোর গতিতে না ছুটিয়ে, আলোর সাহায্যেই আলোর গতির ইলিউশন তৈরি করেছেন।
তারা প্রায় এক মিটার মাপের একটি ঘনক ও একটি গোলকের উপর অতিক্ষুদ্র লেজার পালস নিক্ষেপ করেন। প্রতিটি পালসের দৈর্ঘ্য ছিল কয়েকশ পিকোসেকেন্ড মাত্র। এক বিশেষ ক্যামেরা এই প্রতিফলিত আলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ধারণ করে।

প্রতিবার বস্তুটি সামান্য সরানো হয়। এটা আলোর গতির কাছাকছি বেগে চললে ঘনকটি যে দূরত্ব অতিক্রম করত, তার সমান। এরপর সব টুকরো চিত্র একসাথে জুড়ে দিয়ে তারা এমন একটি ছবি তৈরি করেন যা দেখে মনে হয় বস্তুটি প্রায় আলোর গতিতে ছুটে চলেছে।
ফলাফল ছিল অবিশ্বাস্য। চূড়ান্ত ছবিতে দেখা গেল, বস্তু দুইটি লরেঞ্জ তত্ত্বের মতো চ্যাপ্টা বা সংকুচিত হয়নি। বরং ঠিক যেমনটা পেনরোজ ও টেরেল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বস্তুটি অনেকটা ঘূর্ণন প্রভাব ফুটে উঠেছিল। গোলকটি গোলাকারই ছিল, কিন্তু তার পেছনের দিকও খানিকটা দেখা যাচ্ছিল।

এই পরীক্ষা আইনস্টাইনের তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেনি। বরং ভৌত বাস্তবতা আর আমাদের চাক্ষুষ উপলব্ধির মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখিয়েছে। যা ঘটছে আর যা আমরা দেখছি, এই দুইয়ের মধ্যে আলোর গতি পার্থক্যের সেতুর মত কাজ করে, যা আমাদের চেনা জগতকেও এক মুহূর্তে অচেনা করে তুলতে পারে।
সূত্র: Hornof et al., Communications Physics, 2025
লেখা: রেদোয়ানুল হক রানা

