পৃথিবীতে অতি সাধারণ একটি কাগজের একটি পৃষ্ঠা নিলেই আমরা সহজেই ভাবতে পারি, এটি কত বড় বা শক্ত হতে পারে। সাধারণত আমরা কাগজকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করি, লিখতে, আঁকতে বা ছাপানোর জন্য। কিন্তু কাগজের ভাঁজ করার একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে, যা আমাদের জন্য অদ্ভুত মনে হবে।

বহু বছর ধরে বলা হত, কোনো কাগজকে একাধিকবার ভাঁজ করা সম্ভব নয়। প্রথাগত বিশ্বাস অনুযায়ী, একটি কাগজকে সাতবারের বেশি ভাঁজ করা যায় না। যদিও এটি মনে হয় অতি সাধারণ একটি তথ্য, কিন্তু এই ধারণার পেছনে রয়েছে গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের একটি অসাধারণ সত্য। প্রতিবার ভাঁজ করার সঙ্গে সঙ্গে কাগজের পুরুত্ব দ্বিগুণ হয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রথম ভাঁজে এটি দুটি স্তরে বিভক্ত হয়, দ্বিতীয়বার ভাঁজ করলে চার স্তর, তৃতীয়বার ভাঁজ করলে আট স্তর এবং এভাবে exponential growth ঘটে। ফলে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাগজটি এতই ঘন হয়ে যায় যে আর ভাঁজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।

ব্রিটনি গ্যালিভান


একজন আমেরিকান হাই স্কুলের ছাত্রী, ব্রিটনি গ্যালিভান, এই পুরনো ধারণাটিকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একক কাগজকে সাতবারের বেশি ভাঁজ করা সম্ভব। গ্যালিভানের রেকর্ড অনুযায়ী, তিনি একটি টয়লেট পেপারের পৃষ্ঠা ব্যবহার করে সর্বাধিক ১২ বার ভাঁজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই রেকর্ড শুধুমাত্র প্রমাণ করে যে, তাত্ত্বিকভাবে কাগজকে সাতবারের বেশি ভাঁজ করা সম্ভব, তবে এটি অত্যন্ত কঠিন এবং বিশেষ কৌশল প্রয়োজন।
পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, একটি সাধারণ A4 কাগজের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩০০ মিলিমিটার এবং পুরুত্ব প্রায় 0.05 মিলিমিটার। প্রথমবার ভাঁজ করলে দৈর্ঘ্য অর্ধেক হয়, কিন্তু পুরুত্ব দ্বিগুণ। দ্বিতীয়বার ভাঁজ করলে দৈর্ঘ্য আরও অর্ধেক হয় এবং পুরুত্ব আবার দ্বিগুণ। এইভাবে, অষ্টমবার ভাঁজ করলে কাগজের পুরুত্ব দৈর্ঘ্যের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়। তখন এটি ভাঁজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে, এবং এটি এমনকি একটি ছোট ধাতব কাঠামোর মতো শক্ত হয়ে যায়।


কাগজ ভাঁজের এই exponential growth আমাদের কল্পনার সীমা অতিক্রম করতে সহায়ক। তাত্ত্বিকভাবে যদি আমরা একটি কাগজকে অনেক বেশি বার ভাঁজ করতে পারি, তাহলে কাগজের পুরুত্ব এমনভাবে বৃদ্ধি পাবে যে এটি পৃথিবী বা আমাদের সৌরজগত পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হবে। গবেষক জেসাস ডিয়াজ এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন এবং কিছু চমকপ্রদ উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি জানান, মাত্র ৩০ বার ভাঁজ করলে কাগজটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার উচ্চ হয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করতে পারে। ৪২ বার ভাঁজ করলে কাগজটি চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ৮১ বার ভাঁজ করলে কাগজটির পুরুত্ব প্রায় ১,২৭,৭৮৬ আলোকবর্ষ হয়ে যাবে, যা এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির সমান। এবং ১০৩ বার ভাঁজ করলে কাগজটি দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাইরে চলে যাবে। এটি কেবল গণিতের তত্ত্ব; বাস্তব জগতে এভাবে ভাঁজ করা সম্ভব নয়, তবে এটি exponential growth-এর শক্তিকে চমকপ্রদভাবে দেখায়।


এই তত্ত্বের বাস্তব পরীক্ষা করতে ইউটিউবের একটি জনপ্রিয় চ্যানেল, Hydraulic Press Channel, একটি A3 কাগজকে সাতবার ভাঁজ করার চেষ্টা করেছে। তারা একটি হাইড্রলিক প্রেস ব্যবহার করেছেন যাতে ভাঁজটি সম্পন্ন করা যায়। প্রথম কয়েকটি ভাঁজ সহজেই সম্পন্ন হয়, কিন্তু সপ্তমবারের ভাঁজে অবস্থা পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। যখন প্রেস কাগজে চাপ প্রয়োগ করে, তখন একটি বড় শব্দের সঙ্গে কাগজটি ভেঙে যায়। এটি প্রায়ই বিস্ফোরণ বা ক্র‍্যাম্বল হওয়ার মতো দেখায়। কাগজটি আর তার প্রাথমিক রূপেই থাকে না; এটি একটি কঠিন, সাদা, গুঁড়োর মতো পদার্থে রূপান্তরিত হয়।


পেপার ইঞ্জিনিয়ার থমাস অ্যামিডন এই ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, কাগজের প্রধান উপাদান সেলুলোজ নয়, বরং কাগজে মিশ্রিত ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। এই খনিজ কাগজকে আরও শক্ত ও অস্বচ্ছ করতে যোগ করা হয়। যখন অত্যধিক চাপ প্রয়োগ করা হয়, তখন ক্যালসিয়াম কার্বোনেট স্তরটি ভেঙে যায়। এটি ঠিক এমনভাবে ভেঙে যায়, যেমন একটি সিমেন্টের কলাম চাপের কারণে ধ্বংস হয়। তাই কাগজটি বিস্ফোরণ হয়ে যায়।


এই ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় দিকও দেয়। এটি দেখায় যে কাগজ ভাঁজের প্রতি আমাদের সাধারণ ধারণা কতটা সীমিত এবং তাত্ত্বিকভাবে এটি কত বিস্ময়কর হতে পারে। গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা কল্পনা করতে পারি, একটি সাধারণ কাগজের পুরুত্ব চাঁদ, গ্যালাক্সি বা মহাবিশ্ব পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। আবার বাস্তবে, কাগজের ভৌত সীমা এবং ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের উপস্থিতি এটিকে সীমিত করে।


অন্যদিকে, এই উদাহরণটি exponential growth এবং গাণিতিক বৃদ্ধির ধারণাকে সহজভাবে বোঝাতে সহায়ক। এটি আমাদের দেখায়, ছোট একটি জিনিসও দ্রুত বিরাট আকারে বৃদ্ধি পেতে পারে যদি এটি দ্বিগুণের সূত্রে বৃদ্ধি পায়। কাগজের এই সাধারণ ভাঁজের প্রক্রিয়া আমাদের গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব জগৎকে সংযুক্ত করে।


সর্বশেষে বলা যায়, একটি সাধারণ কাগজ আমাদের কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। গণিত এবং পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা দেখেছি, কাগজকে ৩০ বার ভাঁজ করলে এটি বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করতে পারে, ৪২ বার ভাঁজ করলে চাঁদে পৌঁছায়, ৮১ বার ভাঁজ করলে একটি গ্যালাক্সির সমান পুরুত্ব ধারণ করে, এবং ১০৩ বার ভাঁজ করলে এটি দৃশ্যমান মহাবিশ্ব অতিক্রম করতে পারে।

বাস্তবিকভাবে, এটি অসম্ভব, তবে এই উদাহরণ exponential growth-এর শক্তি এবং গণিতের বিস্ময় দেখায়। আবার Hydraulic Press-এর সাহায্যে কাগজকে সাতবার ভাঁজ করার চেষ্টা আমাদের দেখায় বাস্তব জগতে কাগজের ভৌত সীমা এবং প্রাকৃতিক উপাদান কত গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসুত্রঃ Science Alert

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
0 Comments
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments