১৯৬১ সালে, এমআইটির একজন আবহাওয়াবিদ এডওয়ার্ড লরেঞ্জ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য একটি প্রোগ্রাম চালাচ্ছিলেন। মডেলটি ছিল বেশ কিছু ভেরিয়েবলের উপর ভিত্তি করে যার মধ্যে একটি ভ্যালু ছিল 0.506127। পরে তিনি একই মডেল আবার চালাতে গিয়ে এই সংখ্যাটিকে একটু সহজ করে 0.506 হিসেবে ইনপুট দেন। তারপর কফি খেতে চলে যান। ফিরে এসে দেখেন, এই সামান্য রাউন্ডিংয়ের ফলে আবহাওয়ার পূর্বাভাস একেবারে পাল্টে গেছে!

১৯৭২ সালে, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স (AAAS)-এর এক বৈঠকে লরেঞ্জ তার এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি প্রশ্ন করেন, ব্রাজিলে একটা প্রজাপতির ডানা ঝাপটানো কি টেক্সাসে একটা ঘূর্ণিঝড় তৈরি করতে পারে?

বোঝাতে চেয়েছিলেন, কোনো একটি সিস্টেম যদি খুবই জটিল হয়, তাহলে সেখানে ছোট্ট একটা পরিবর্তন ভবিষ্যতে বিশাল কিছু ঘটাতে পারে। ইউনিভার্সিটি কর্পোরেশন ফর অ্যাটমোসফেরিক রিসার্চ-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এ. এনথেস, বলেন, এটি প্রমাণ করে যে সহজ কিছু গাণিতিক সমীকরণের মধ্যেও যদি একটুখানি সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে তার ফল হতে পারে বিশাল এবং অপ্রত্যাশিত।

পেন্ডুলাম

এর একটা সহজ উদাহরণ হলো ডাবল পেন্ডুলাম বা দ্বৈত দোলক। এই যন্ত্রের চলাচল এতটাই জটিল হয় যে, একটুখানি শুরুতে পরিবর্তন হলে শেষ পর্যন্ত তার গতিপথ হয়ে যায় সম্পূর্ণ আলাদা এবং ভবিষ্যদ্বাণী করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। লরেঞ্জের প্রজাপতি রূপকটি এমন একটি ধারণা তুলে ধরে যা সহজ হলেও গভীর এবং বিস্ময়কর যা শুধু বিজ্ঞানী মহলে নয় সাধারণ মানুষের মধ্যেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

সান ডিয়েগো স্টেট ইউনিভার্সিটির গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বো-ওয়েন শেন বলেন, লরেঞ্জ যে আনুমানিকতার কথা বলেছিলেন সেটা বিজ্ঞানকে একটা দার্শনিক স্তরে নাড়িয়ে দেয়। ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা কতটা নির্ভুলভাবে মডেল করা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। শেন আরও বলেন, এই ধারণা আমাদের আশা দেয় যে ক্ষুদ্র একটি কাজও হয়তো ভবিষ্যতে বড় কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

এই প্রভাবটি নিয়ে সিনেমা তৈরি হয়েছে, আবার সোশ্যাল মিডিয়াতেও এটা নিয়ে ট্রেন্ড হয়েছে। মানুষ সেখানে বলেছে, গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমি একটা ট্রেন মিস করেছিলাম আর সেই কারণেই আজ আমি আমার জীবনসঙ্গীকে পেয়েছি। অথবা, জুতোর ফিতা ছিঁড়ে যাওয়ায় আমি সেদিন এক মিনিট দেরি করেছিলাম, আর ওই এক মিনিটেই আমি একটা বড় দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে গেছি। কিন্তু এই গল্পগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লরেঞ্জের আসল বৈজ্ঞানিক থিওরির সঙ্গে মেলে না। এগুলো আসলে ‘coincidence’ বা কাকতালীয় ঘটনা যার পেছনে কোনো গাণিতিক বিশ্লেষণ নেই।

তবুও, বিজ্ঞানীরা এখনো এই বাটারফ্লাই ইফেক্ট ধারণাকে ব্যবহার করছেন। কারণ এটি দিয়ে আমরা বর্তমানে যা করি, তার প্রভাব ভবিষ্যতে কীভাবে বড় কিছুতে রূপ নিতে পারে তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

কেন প্রজাপতির প্রভাব বৈজ্ঞানিক বিতর্কের বিষয়

বাটারফ্লাই ইফেক্ট নিয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা আর বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণের মাঝে এক ধরনের বিভ্রান্তি আছে। বেশিরভাগ মানুষ ভাবেন, একটি ছোট ঘটনা যেমন প্রজাপতির ডানা ঝাপটানো আসলেই অনেক দূরে বড় কিছু ঘটাতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ব্যাপারটি এক ধরনের রূপক বা উপমা মাত্র।

গণিত ও পরিসংখ্যানবিদ বো ওয়েন শেন বলছেন, এই বাটারফ্লাই ইফেক্ট আসলে একটা রূপক। তিনি জানান, এই বিষয়ের উপর যারা সবচেয়ে বেশি গবেষণা করেছেন তারাও একমত যে এটি অনেকটা শ্রোডিনজারের বিড়ালের মতো ধারণা যা একেবারে প্রমাণিত বা একেবারে ভুল বলা যায় না। অর্থাৎ এটা এমন একটি ভাবনা যা না পুরোপুরি সত্য, না পুরোপুরি মিথ্যা।

রজার পিয়েলকে সিনিয়র নামের একজন প্রখ্যাত আবহাওয়াবিদ বলেন, প্রজাপতির ডানা ঝাপটিয়ে হাজার কিলোমিটার দূরে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার বাস্তব কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এমনকি একেবারে কাছাকাছি কোনো ঝড়ের ঘটনাও এর দ্বারা ঘটানো সম্ভব না। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সম্ভাবনাকে একেবারে না বলতে হবে।

এই নিয়ে যদি কেউ বিভ্রান্ত হন সেটি খুবই স্বাভাবিক। কারণ বিজ্ঞানীরাও একে নিয়ে একমত নন। ২০২৪ সালে ফিজিক্স টুডে নামের বৈজ্ঞানিক পত্রিকায় বো ওয়েন শেনের দল আর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিদ টিম পামারের মধ্যে এ নিয়ে এক ধরনের তর্কবিতর্ক প্রকাশিত হয়।

পামার বলেন, লরেঞ্জ যখন বাটারফ্লাই ইফেক্ট নিয়ে কথা বলেছিলেন তখন তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে আবহাওয়া আসলে অনেকগুলো ছোট ছোট প্রাকৃতিক ঘটনায় তৈরি হয়। যেগুলো একসঙ্গে মিলেই কোনো এক সময় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

পামার এখানে আবহাওয়াকে বোঝানোর জন্য রাশিয়ান পুতুলের একটা দারুণ উদাহরণ দিয়েছেন। রাশিয়ান পুতুল মানে হলো একটা বড় পুতুলের ভিতরে আরেকটা ছোট পুতুল, তার ভিতরে আরও ছোট, এভাবে একটার ভিতরে আরেকটা লুকানো থাকে। একইভাবে, পামার বলেন আবহাওয়া একেবারে এমনই।

ধরুন, আকাশে এক বিশাল নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে যেটা অনেক বড় জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে যা প্রায় হাজার কিলোমিটার। এই বিশাল নিম্নচাপের ভেতরে থাকে অনেকগুলো মাঝারি আকারের বজ্র মেঘ যার প্রতিটা প্রায় ১০০ কিলোমিটার। এই বজ্র মেঘগুলোর ভেতরে আবার আরও ছোট ছোট মেঘ থাকে, যেগুলো আরও ছোট স্কেলের। এই ছোট মেঘগুলোর মাঝেও থাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘূর্ণি বা ঝড়ের মতো ঘূর্ণায়মান হাওয়া।

এইভাবে বড় আবহাওয়াগত গঠনগুলোর ভেতরে ধাপে ধাপে আরও ছোট ছোট উপাদান থাকে যেগুলোর মধ্যে সম্পর্কও আছে। এখানে মূল কথা হলো আবহাওয়ার বড় ঘটনা (যেমন নিম্নচাপ, ঝড়) অনেকগুলো ছোট ঘটনা দিয়ে গঠিত, আর এই ছোট ঘটনাগুলোর ভেতরেও আরও ক্ষুদ্র উপাদান থাকে। আর এই সমস্ত কিছু মিলেই আবহাওয়ার চূড়ান্ত রূপ তৈরি করে।

এই ব্যাখ্যার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, আবহাওয়া একটা জটিল গঠন যার ভিতরে আরও অনেক স্তর থাকে, আর প্রতিটা স্তরে ছোট পরিবর্তনও বড় পরিণতি তৈরি করতে পারে। এজন্যই আবহাওয়া ভবিষ্যদ্বাণী করা এত কঠিন।

পামার নিজেই এই বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, পৃথিবীর সিস্টেমে এমন কিছু সীমা আছে যেটার বাইরে ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব না। তিনি ২০১৪ সালের একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে বলেন,

আমাদের ভবিষ্যৎ বোঝার একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে, যেটা শুধু প্রাথমিক তথ্য আরও ভালো জানলেই অতিক্রম করা যায় না।

শেন বলেন, বাটারফ্লাই ইফেক্ট বোঝাতে একটি প্রাচীন উপকথা বা প্রবাদ সবচেয়ে ভালো উদাহরণ। এই প্রবাদটি প্রথম লিখিত আকারে আসে ১৬৪০ সালে কবি জর্জ হারবার্টের লেখায়।

প্রবাদটি ছিল এমন যে

একটি পেরেক না থাকায় জুতো হারালাম,
জুতো না থাকায় ঘোড়া হারালাম,
ঘোড়া না থাকায় অশ্বারোহী হারালাম।

এই কথাগুলো দিয়ে বোঝানো হয়েছে, খুব ছোট কিছু অভাব একসময় গড়িয়ে বড় ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।

এই প্রবাদটির আরও কিছু চরণ আছে। সেগুলো হলো-

অশ্বারোহী না থাকায় যুদ্ধ হারলাম
যুদ্ধ না থাকায় রাজ্যটাই হারিয়ে গেল
আর এই সবই ঘটলো শুধু একটি ঘোড়ার নাল না থাকার কারণে।

বো ওয়েন শেন বলেন, এই কবিতার কয়েকটি চরণ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শেখায়। তিনি বলেন, এতে বোঝানো হয়েছে যে একটি ছোট ছোট পরিবর্তন বা সমস্যা একসময় সংখ্যাগত হিসাবেও বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। ঠিক যেমনটা লরেঞ্জ দেখিয়েছিলেন তার আবহাওয়ার মডেলে।

তবে লরেঞ্জের মতে, এই ধরনের উপকথা বা প্রবাদ আসলে খুব ভালোভাবে বোঝাতে পারে যে, কীভাবে একটি ব্যবস্থা ধীরে ধীরে অস্থির হয়ে ওঠে বা বিপথে চলে যায়। অর্থাৎ এটি প্রমাণ করে যে, কোনো একটি ছোট ঘটনা শুধু তা-ই নয়, তার পরপর ঘটে যাওয়া অন্য ছোট ঘটনাগুলোও একসঙ্গে মিলে শেষ পর্যন্ত বড় কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

এই প্রবাদ আমাদের আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয় যে যদি একবার ফলাফল ঘটে যায়, তাহলে পরবর্তী ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো সেই ফলাফল আর ফেরাতে পারে না।

প্রজাপতির প্রভাব বা বাটারফ্লাই ইফেক্ট আমাদের বিজ্ঞানীদের হাতে এমন এক দারুণ সরঞ্জাম তুলে দিয়েছে যার মাধ্যমে তাঁরা ক্যাওস বা বিশৃঙ্খলা নামক একটি জটিল ধারণাকে আরও ভালোভাবে বোঝার সুযোগ পেয়েছেন।

গণিতবিদ বো ওয়েন শেন বলেন, প্রফেসর লরেঞ্জের একটি অসাধারণ অবদান হলো তাঁর তৈরি মডেল এবং বিশ্লেষণ পদ্ধতি। তাঁর এই কাজগুলো বহু গবেষণাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং আমাদের অগোছালো বা এলোমেলো মনে হওয়া প্রকৃতির ভেতরের নিয়মগুলো বুঝতে সাহায্য করেছে। সেই সঙ্গে এটা প্রমাণ করেছে যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা আসলে সীমিত।

বিজ্ঞানীরা এখন জানেন যে পৃথিবীর অনেক ব্যবস্থাই আসলে ক্যাওটিক বা বিশৃঙ্খল প্রকৃতির। যেমন আবহাওয়া, একটি নির্দিষ্ট প্রাণীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, এমনকি রাস্তার গাড়ির চলাচলও। এই ধরনের ক্যাওটিক সিস্টেমে আমরা দুই রকম ফলাফল দেখতে পাই। কখনও পুরো সিস্টেমটাই বিশৃঙ্খল আচরণ করে যেটা দেখতে এলোমেলো মনে হয়, কিন্তু আসলে সেটা শুরুতেই যেভাবে শুরু হয়েছে তার প্রতি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। আবার কখনও একইসাথে নিয়ম মেনে চলা ও বিশৃঙ্খল আচরণ দুইটাই একসাথে দেখা যায়।

তবে এই মানে নয় যে প্রতিটি ছোট পরিবর্তনই বিশাল প্রভাব ফেলবে। অনেক সময় ছোট পরিবর্তনের প্রভাব খুবই সীমিত বা একেবারেই তেমন কিছু করে না। বাস্তব পৃথিবীতে এই প্রভাব অনেক সময়ই কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকে।

বো ওয়েন শেন একটি সুন্দর উপমা দিয়ে বলেন, কল্পনা করুন একটা বিশাল নদী সাগরের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর মূল স্রোত অনেক বড়, কিন্তু তার ভেতরে ছোট ছোট ঘূর্ণি বা স্রোতের ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। এই ছোট ছোট ঢেউগুলো একা একা দেখলে এলোমেলো ও অপ্রতিরোধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু পুরো নদীর গতিপথের কথা মাথায় রাখলে বোঝা যায়, এগুলোও একধরনের নিয়ম মেনেই চলছে। আবহাওয়াতেও এই ধারণা প্রযোজ্য। যদি আপনি বড় আকারের আবহাওয়া প্যাটার্ন দেখতে পারেন, তাহলে ছোট ছোট এলোমেলো ঘটনার দিকেও কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

অন্যদিকে রিচার্ড এনথেস সহজ ভাষায় বলেন, সব প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোই কিন্তু পৃথিবীর আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে না। অনেক প্রজাপতির ডানার ঝাপটানো কোনো পার্থক্যই আনেনা।

লরেঞ্জের তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা বর্তমান আবহাওয়াকে যতই নিখুঁতভাবে মেপে রাখি না কেন, ভবিষ্যতের আবহাওয়া ঠিকভাবে পূর্বাভাস দেওয়ার একটা সীমা আছে। সাধারণভাবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দুই এক সপ্তাহের বেশি এগিয়ে বলা বাস্তবে খুবই কঠিন।

তবে বো ওয়েন শেন ও তাঁর দল এই সীমা কোথায় গিয়ে থামে তা পরীক্ষা করতে চান। তাঁরা লরেঞ্জের মডেল ব্যবহার করে গবেষণা করছেন এবং দেখাচ্ছেন কীভাবে আবহাওয়া ও জলবায়ুতে নিয়ম ও বিশৃঙ্খলা একসাথে কাজ করে।

বাটারফ্লাই ইফেক্ট বা প্রজাপতি প্রভাব সাধারণত আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়। তবে এই ধারণা শুধু আবহাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ব্যাপক প্রক্রিয়াকেও ব্যাখ্যা করতে এটি ব্যবহৃত হতে পারে। সম্প্রতি কিছু গবেষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে এই প্রজাপতি প্রভাবের ধরণ অনুকরণ করতে চেয়েছিলেন যাতে আবহাওয়া পূর্বাভাস আরও উন্নত করা যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এআই এই প্রভাবটি ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মানে এই নয় যে প্রজাপতি প্রভাব ভুল, বরং এর মানে হলো এই প্রভাব এতটাই জটিল ও সূক্ষ্ম যে এখনকার এআই প্রযুক্তির পক্ষে তা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়।

লরেঞ্জ এবং তাঁর প্রজাপতি প্রভাব নিয়ে কাজ এখনো বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রভাব ফেলছে। ক্যাওস থিওরি বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব শুধু আবহাওয়া বা জলবায়ু নয়, বিজ্ঞানের অনেক শাখায় আমূল পরিবর্তন এনেছে যেমন পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, প্রকৌশল, অর্থনীতি, এমনকি সমাজবিজ্ঞানেও। রিচার্ড এনথেস বলেন, লরেঞ্জের এই তত্ত্বটি এমন সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যেখানে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করে বর্তমানের অবস্থার উপর।

এনথেস ব্যাখ্যা করেন, প্রজাপতি প্রভাব প্রায় সব ধরনের জটিল ব্যবস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেখানে ভবিষ্যতের অবস্থা নির্ভর করে বর্তমানের সূক্ষ্ম পরিস্থিতির উপর যেমন বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর, জলবায়ু, পদার্থবিজ্ঞানের নানা প্রক্রিয়া, মানব স্বাস্থ্যসহ নানা জৈবিক ব্যবস্থা, এমনকি সমাজ, রাজনীতি, আর্থিক ব্যবস্থা সবকিছুর মধ্যেই এই প্রভাব কাজ করে। অনেক সময় এমন ছোট ছোট পরিবর্তন, যেগুলোকে আমরা তুচ্ছ ভেবে এড়িয়ে যাই, ভবিষ্যতে বিশাল ও অপ্রত্যাশিত এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

২০১১ সালে এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান চালু করে যার নাম রাখা হয়েছিল লরেঞ্জের নামে। এই প্রতিষ্ঠান মূলত এমন সব গবেষণাকে তহবিল দেয় যেগুলোর তাৎক্ষণিক বাস্তব প্রয়োগ নেই। একে বলা হয় পরিশুদ্ধ গবেষণা বা pure research। এই ধরনের গবেষণা আমাদের শেখায় যে অনেক ছোট পদক্ষেপ বা ঘটনাও ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে যেমন একটি প্রজাপতির হালকা ডানা ঝাপটানো।

একটা বাস্তব ও ঐতিহাসিক উদাহরণ

১৯১৪ সালের ২৮ জুন, বসনিয়ার সারায়েভো শহরে ঘটেছিল একটি এমন ঘটনা যার প্রভাব পড়েছিল গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে এবং যেটিকে নিঃসন্দেহে বাস্তব Butterfly Effect এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ বলা যায়। সেদিন অস্ট্রো-হাঙ্গেরির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফেরডিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফি একটি সরকারি সফরে শহরে এসেছিলেন। তাঁদের হত্যা করতে পরিকল্পনা করেছিল কয়েকজন সার্ব জাতীয়তাবাদী যুবক।

প্রথম হামলাটি হয় একটি গ্রেনেড ছুঁড়ে, কিন্তু তা লক্ষভ্রষ্ট হয় এবং আর্চডিউক দম্পতি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। এর কিছুক্ষণ পর তাঁরা আহত সেনা সদস্যদের দেখতে হাসপাতালে যাচ্ছিলেন কিন্তু এই নতুন পরিকল্পনার কথা তাঁদের গাড়িচালক জানতেন না। ফলে, ড্রাইভার ভুল করে পুরনো রাস্তায় ঢুকে পড়েন।

Governor Potiorek চিৎকার করে ভুল ধরিয়ে দিলেও, ড্রাইভার গাড়ি ঘুরাতে গিয়ে হঠাৎ এক দোকানের সামনে থেমে যান আর সেই দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন গ্যাভরিয়েল প্রিন্সিপ নামের একজন তরুণ জাতীয়তাবাদী, যিনি কিছুক্ষণ আগেই আক্রমণ করেছিলেন এবং হতাশ হয়ে ভেবেছিলেন যে তাঁর হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

চোখের সামনে রাজকীয় গাড়ি থেমে যেতে তিনি এই অপ্রত্যাশিত সুযোগ কাজে লাগান। এর পরাপরই দুটি গুলি চালান যা একটি আর্চডিউকের ঘাড়ে আরেকটি সোফির পেটে গিয়ে লাগে। দুজনই কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যান। সেই মুহূর্তে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড একটি জাতীয় সংকট তৈরি করে, যার জেরে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সার্বিয়াকে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়, আর জার্মানি এসে জোট বাঁধে অস্ট্রো-হাঙ্গেরির সঙ্গে।

ফলস্বরূপ ইউরোপের প্রধান শক্তিগুলো একে একে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, এবং তা রূপ নেয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধে, যেখানে প্রায় দুই কোটি মানুষ নিহত হয়। এর থেকে শুরু হয় আরও বড় বড় ঘটনা যা রাশিয়ান বিপ্লব, নাৎসি জার্মানির উত্থান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রের আমূল পরিবর্তন। আর এই সবকিছুর সূচনা হয়েছিল এক ড্রাইভারের ভুল মোড় নেওয়া একটি থেমে যাওয়া গাড়ি এবং এক হতাশ হত্যাকারীর হঠাৎ পাওয়া সুযোগ থেকে। এটিই Butterfly Effect যেখানে এক ক্ষুদ্র ও আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ ঘটনা ভবিষ্যতে তৈরি করতে পারে এক ভয়াবহ, বিশাল প্রভাব। ইতিহাসে এর চেয়ে শক্তিশালী বাস্তব উদাহরণ আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া কঠিন।

তথ্যসুত্রঃ National Geographic, Britannica

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
1 Comment
Most Voted
Newest Oldest
Inline Feedbacks
View all comments
mehedionion
mehedionion
8 months ago

বাটারফ্লাই ইফেক্ট নিয়ে অনেক শুনেছি, কিন্তু এত বৈজ্ঞানিকভাবে আগে বুঝিনি। দারুণ লাগলো।